০৪/০৯/২০২৬ · ৪ মিনিট পড়া
এজমালি সম্পত্তি হলেই কি আগে বণ্টন মামলা করতে হবে?
এজমালি সম্পত্তি হলেই কি আগে বণ্টন মামলা করতে হবে? জমি নিয়ে বিরোধে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—সম্পত্তি যদি এজমালি বা যৌথ মালিকানাধীন হয়, তাহলে আগে বণ্টন (Partition) না করে কেউ নির্দিষ্ট জমির মালিকানা ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করতে পারবেন না। কিন্তু আইন সব পরিস্থিতিতে এমন কঠোর নিয়ম আরোপ করে না।
যদি একজন ব্যক্তি বৈধ দলিলের মাধ্যমে জমি ক্রয় করেন, নিজের নামে নামজারি করেন, দীর্ঘ সময় সেই জমির দখলে থাকেন এবং পরবর্তীতে অন্য কেউ এসে তাকে সেই নির্দিষ্ট জমি থেকে উচ্ছেদ করে দখল নেয়, তাহলে শুধু এই কারণে তার মামলা অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে না যে জমিটির পূর্ববর্তী মালিকরা যৌথ মালিক ছিলেন।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—বাদী কি তার স্বত্ব (title), পূর্ববর্তী দখল (prior possession) এবং পরবর্তী বেদখল (dispossession) প্রমাণ করতে পারছেন?
Appellate Division স্পষ্টভাবে বলেছেন, দখল পুনরুদ্ধারের মামলায় বাদীকে প্রথমে তার দখল এবং পরে সেই দখল থেকে বেদখল হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করতে হবে। যদি দলিল, সীমানা, নামজারি, খাজনা প্রদান এবং অন্যান্য মৌখিক ও দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখা যায় যে বাদী আগে থেকেই জমির দখলে ছিলেন এবং পরে বিবাদী তাকে উচ্ছেদ করে দখল নিয়েছেন, তাহলে মালিকানা ঘোষণা ও খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলা আইনগতভাবে চলতে পারে। এ অবস্থায় বাদীর জন্য পৃথকভাবে বণ্টনের দাবি করা অপরিহার্য নয়।
বাস্তব জীবনে এই নীতির গুরুত্ব কোথায়?
ধরা যাক, আপনি ১৯৯১ সালে একটি নির্দিষ্ট জমি রেজিস্ট্রি করে কিনলেন। দলিলে জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা উল্লেখ আছে। পরে নামজারি করলেন এবং জমি ভোগদখলেও থাকলেন। কয়েক বছর পর একই মূল মালিকানার অন্য অংশীদারের কাছ থেকে আরেক ব্যক্তি দলিল নিয়ে এসে দাবি করলেন যে জমিটি তার এবং আপনাকে দখলচ্যুত করলেন।
এখন প্রশ্ন হতে পারে—আপনাকে কি অবশ্যই পুরো যৌথ সম্পত্তির বণ্টন মামলা করতে হবে?
এই রায়ের উত্তর হলো, সব ক্ষেত্রে নয়।
যদি আপনি প্রমাণ করতে পারেন যে আপনার ক্রয় আগে হয়েছে, আপনি নির্দিষ্ট জমির দখলে ছিলেন এবং পরবর্তী ক্রেতা এসে আপনাকে সেই জমি থেকে বেদখল করেছে, তাহলে আপনার প্রতিকার কেবল বণ্টন মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আপনি মালিকানা ঘোষণা এবং খাস দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকার চাইতে পারেন।
রায়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুই পক্ষের দলিলে সীমানার মিল, পূর্ববর্তী ক্রয়, নামজারি, সরকারি খাজনা প্রদান এবং কে আগে জমির দখলে ছিলেন—এসব বিষয় আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ শুধু “আমার দলিল আছে” বলাই যথেষ্ট নয়; দলিলের সঙ্গে বাস্তব দখল এবং বেদখলের ঘটনাও প্রমাণের বিষয়।
পরবর্তী ক্রেতা ও পূর্ববর্তী দখলদারের অবস্থান এক নয়
এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আদালত পূর্ববর্তী ক্রেতা ও পরবর্তী ক্রেতার অবস্থানকে একইভাবে দেখেননি।
যিনি আগে জমি কিনেছেন এবং দখলে ছিলেন, তাকে পরবর্তী ক্রেতার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বণ্টন মামলায় যেতে বাধ্য করা যাবে না। বরং রায়ের ভাষায়, পরবর্তী ক্রেতা যদি নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বণ্টনের প্রয়োজন অনুভব করেন, সেই পদক্ষেপ নেওয়ার দায় তার ওপর বর্তাতে পারে। পূর্ববর্তী ক্রেতা, যিনি নিজের স্বত্ব ও দখল প্রমাণ করে পরে বেদখল হয়েছেন, তার ক্ষেত্রে শুধু declaration ও recovery of khas possession-এর মামলা অগ্রহণযোগ্য বলা যাবে না।
জমির মামলায় আসল লড়াই কোথায়?
অনেক litigant মনে করেন, একটি রেজিস্ট্রি দলিল থাকলেই মামলার ফল নির্ধারিত হয়ে যাবে। বাস্তবে জমির বিরোধে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।
কোন দলিল আগে হয়েছে, দুই দলিলের সীমানা একই কি না, ক্রেতা বাস্তবে কখন দখল পেয়েছেন, নামজারি হয়েছে কি না, খাজনা দেওয়া হয়েছে কি না, বেদখলের নির্দিষ্ট ঘটনা আছে কি না এবং নিম্ন আদালত কোন evidence-এর ভিত্তিতে কী finding দিয়েছেন—এসব প্রশ্ন মামলার ফল পরিবর্তন করতে পারে।
এই মামলাতেও Trial Court বাদীর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল এবং বেদখলের ঘটনা প্রমাণিত পেয়েছিল। কিন্তু প্রথম Appellate Court মূলত এজমালি সম্পত্তি ও বণ্টন না হওয়ার যুক্তিতে মামলা খারিজ করেছিল। High Court Division Trial Court-এর সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল করেন এবং Appellate Division শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থানই বহাল রাখেন।
এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হলো Rezaul Huq vs. Mossammat Monwara Khanam and others, 20 SCOB [2025] AD 61, Civil Appeal No. 726 of 2016। ২০ মে ২০২৫ তারিখে প্রদত্ত রায়ে Appellate Division আপিল খারিজ করে High Court Division কর্তৃক Trial Court-এর decree পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এজমালি সম্পত্তির প্রশ্ন উঠলেই বণ্টন মামলা বাধ্যতামূলক নয়; আগে দেখতে হবে—কার স্বত্ব আগে প্রতিষ্ঠিত, কে বাস্তবে দখলে ছিল এবং কাকে পরে বেআইনিভাবে বেদখল করা হয়েছে। জমির মামলায় কেবল দলিল নয়, দলিলের সঙ্গে দখলের ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।